ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা যে মানুষের স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না, তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সন্তান মোঃ শরীফ উদ্দিন। নাসিরনগর উপজেলার প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চল থেকে উঠে এসে তিনি এখন বিসিএস ক্যাডার। ৪৭তম বিসিএসে তিনি ইংরেজি বিভাগ থেকে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন। শরীফ উদ্দিনের এই পথচলা কেবল একজন ব্যক্তির সাফল্য নয়, বরং অবহেলিত জনপদের হাজারো তরুণের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা। শিকড়ের গল্প ও প্রতিকূলতা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামে জন্ম শরীফ উদ্দিনের। পিতা মোঃ নিজাম উদ্দিন এবং মাতা ইস্নেহার বেগমের যোগ্য সন্তান তিনি। হাওরবেষ্টিত চাতলপাড় ইউনিয়নটি দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগ-ব্যবস্থায় অবহেলিত। বর্ষাকালে এই অঞ্চলটি জলরাশির বুকে ভাসমান এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে পরিণত হয়। এমন রূঢ় বাস্তবতায় যেখানে অনেক শিশুর স্বপ্ন অঙ্কুরেই ঝরে যায়, সেখানে প্রতিকূলতাকে জয় করার স্বপ্ন বুনেছিলেন শরীফ। শিক্ষা জীবনের কৃতি গাঁথা মাদরাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে শরীফ উদ্দিনের শিক্ষার হাতেখড়ি। তিনি ২০১৩ সালে মানবিক বিভাগ থেকে দাখিল এবং ২০১৫ সালে আলিম পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর তিনি ভর্তি হন ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে (জবি)। সেখান থেকে তিনি ইংরেজি বিভাগ থেকে সফলতার সাথে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষা শেষে তিনি দেশের বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক 'সোনালী ব্যাংক পিএলসি'-তে কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি বলেন, "আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি—ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা নয়, মানুষের আসল পরিচয় গড়ে দেয় তার স্বপ্ন, অধ্যবসায় এবং অবিচল চেষ্টা। তাই নিজের অর্জনকে কখনো ব্যক্তিগত সাফল্য ভাবিনি; এটি আমার গ্রামের প্রতিটি শিশুর জন্য একটি বার্তা—'তুমিও পারবে।' > — মোঃ শরীফ উদ্দিন এলাকা নিয়ে বড় স্বপ্ন নিজের সাফল্য নিয়ে শরীফ উদ্দিনের ভাবনা বেশ দূরদর্শী। তিনি চান তাঁর এই অবস্থান দেখে এলাকার অভিভাবকেরা যেন সন্তানদের শিক্ষার প্রতি আরও বেশি সচেতন হন। তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্ন—চাতলপাড় ইউনিয়ন একদিন ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতার অববাদ মুছে ফেলে শিক্ষিত, সৎ ও মেধাবী মানুষের চারণভূমি হিসেবে দেশজুড়ে পরিচিতি পাবে। তরুণদের উদ্দেশ্যে বার্তা তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে সোনালী ব্যাংকের এই কর্মকর্তা বলেন, "হাওরের ঢেউ যেমন বারবার তীর ছুঁয়ে যায়, তেমনি নিরন্তর চেষ্টা মানুষকে একদিন স্বপ্নের তীরে পৌঁছে দেয়।" তিনি তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনটি মূল মন্ত্রের কথা উল্লেখ করেন— ১. বড় স্বপ্ন দেখা এবং সততার সাথে পরিশ্রম করা। ২. ব্যর্থতাকে শিক্ষক হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা রাখা। ৩. সর্বাবস্থায় মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। শরীফ উদ্দিনের মতে, আপনি কোথা থেকে শুরু করেছেন, ইতিহাস তা মনে রাখে না; ইতিহাস মনে রাখে আপনি কোথায় পৌঁছেছেন এবং আপনার সাফল্য দিয়ে কত মানুষের জীবনে আলো জ্বালিয়েছেন।" নাসিরনগরের রতনপুর গ্রাম থেকে শুরু হওয়া শরীফ উদ্দিনের এই জয়যাত্রা প্রমাণ করে, দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি থাকলে যেকোনো দুর্গম পথই পাড়ি দেওয়া সম্ভব। এলাকার তরুণ সমাজ তাঁকে নিজেদের রোল মডেল হিসেবে দেখছেন।