
বরিশালের লাহার হাটে, নদীর বুকে ভাসতে থাকা এক টুকরো জনপদ। কাঠের নৌকাই যাদের ঘর, ঢেউয়ের দোলাই যাদের নিত্যসঙ্গী। এই ভাসমান মানতা সম্প্রদায়ের প্রায় ১২৮টি পরিবার নদীর বুকেই কাটিয়ে দেয় জীবনের প্রতিটি দিন, প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই করে যায় নীরবে, চোখের আড়ালে। সেই নীরবতা ভেঙে সম্প্রতি তাদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল এন্টি চাইল্ড ম্যারেজ অর্গানাইজেশন।

সংগঠনের অর্গানাইজিং সেক্রেটারি মাহিন আলম আম্মান নৌকায় নৌকায় গিয়ে বসেন মানতা পরিবারগুলোর পাশে। তিনি শোনেন তাদের মনের কথা। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে শরীরে-মনে যে ক্ষত তৈরি হয়েছে, সংসারের ভার বইতে গিয়ে যে কষ্ট সয়েছেন এই মায়েরা, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হয়েছেন তারা। এই সফরে তার সঙ্গে ছিলেন এন্টি চাইল্ড ম্যারেজ অর্গানাইজেশনের বরিশালের চেঞ্জমেকাররা, যারা মাঠপর্যায়ে এই পরিবর্তনের কারিগর। শুধু বাল্যবিবাহ নিয়েই নয়, আম্মান তাদের সঙ্গে কথা বলেন তাদের মৌলিক অধিকার নিয়েও, একজন নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছ থেকে তারা কী কী সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি সেবা পাওয়ার যোগ্য, আর সেগুলো কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে তাদের সচেতন করেন। পাশাপাশি মা ও শিশুস্বাস্থ্যের যত্ন নিয়েও কথা বলেন, নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা আর সচেতনতার মাধ্যমে কীভাবে অনেক ঝুঁকি এড়ানো যায় সে পরামর্শও দেন।
নদীর জলে ভাসমান এই সংসারে বেড়ে ওঠা নারীদের অনেকেরই বিয়ে হয়ে গেছে কিশোরী বয়সেই। মাছ ধরাই এই পরিবারগুলোর একমাত্র জীবিকা। নদীর জলে জাল ফেলে যা ওঠে, তা দিয়েই চলে সংসার। কোনো দিন মাছ না পেলে সেদিন চুলায় হাঁড়ি চড়ে না, না খেয়ে রাত কাটাতে হয় সন্তানদের নিয়ে। অল্প বয়সে মা হওয়া, পুষ্টির অভাব, চিকিৎসাসেবার নাগালের বাইরে থাকা, আর প্রতিটি দিনের অনিশ্চয়তা। এসব মিলিয়ে তাদের জীবনযুদ্ধ যেন কোনো শেষ না হওয়া গল্প। তবু সংকীর্ণ নৌকার কোণে বসে তারা স্বপ্ন দেখেন, তাদের সন্তানরা যেন তাদের মতো এই কষ্টের চক্রে না জড়ায়। কথোপকথনে বারবার উঠে আসে বাল্যবিবাহের ক্ষত অপরিণত বয়সে গর্ভধারণের স্বাস্থ্যঝুঁকি, স্কুলের চৌকাঠ না পেরোনোর আক্ষেপ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা। মাহিন আলম আম্মান ও তার সহযোগী চেঞ্জমেকাররা এসব পরিবারকে বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সচেতন করেন, আর কন্যাশিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
শুধু কথা বলা আর শোনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি আম্মান। সারাদিন তিনি মিলেমিশে গিয়েছিলেন মানতা পরিবারগুলোর সঙ্গে, তাদের নৌকায় বসে সময় কাটিয়েছেন, বাচ্চাদের সঙ্গে হেসেছেন, মায়েদের পাশে বসে তাদের রান্না-বান্না আর সংসারের গল্প শুনেছেন। এই কাছে থাকা, এই মিশে যাওয়ার মধ্য দিয়েই মানতাদের আস্থা অর্জন করা সহজ হয়ে ওঠে, আর তাদের মনের গহীনের কথাগুলোও উঠে আসে অকপটে।
এই যাত্রায় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট, যারা দ্যা এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় লাহার হাট ফেরিঘাটে মানতা সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছে একটি ডিজিটাল লার্নিং সেন্টার। “অ্যাক্সেস টু লার্নিং” নামের এই কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা উদ্যোগ ভাসমান মানতা শিশুদের জন্য শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখেছে, আর সেই আলোই হয়ে উঠতে পারে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের দীর্ঘমেয়াদী হাতিয়ার। জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের এই মানতা প্রোজেক্টের ফ্যাসিলিটেটর সুমন রহমান এই পুরো কার্যক্রমে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা করেন, স্থানীয় পরিবার আর সংগঠনের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলেন নিজের হাতে।
মানতাদের মতো ভাসমান জনগোষ্ঠীর কাছে সচেতনতার আলো পৌঁছানো সহজ নয়। তাদের ঠিকানা বদলায় স্রোতের সাথে, জীবন বাঁধা থাকে দাঁড় আর পালের ছন্দে। তবু এই ধরনের প্রত্যক্ষ, মানবিক উদ্যোগ প্রমাণ করে দেয়। বদলের শুরুটা হয় মানুষের পাশে বসে তার কথা শোনা দিয়েই। এন্টি চাইল্ড ম্যারেজ অর্গানাইজেশনের এই ছোট্ট উদ্যোগ যেন নদীর বুকে ভাসতে থাকা এক টুকরো আশা যেখানে বাল্যবিবাহের অন্ধকার সরিয়ে ধীরে ধীরে জ্বলে উঠছে সচেতনতার প্রদীপ।
Leave a Reply